ভবানীপুর ..
না, তারও আগে আছে তার আসল নায়িকা।
“আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে –
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে”
না, আমাদের ছোট নদীতে বৈশাখ মাসে হাঁটু জল থাকে না। রোজ দুবেলা তাতে
জোয়ার ভাঁটা খেলে। তাই ভাঁটার সময় কোথাও কোথাও হাঁটু জল হলেও জোয়ারে তাতে এত জল হয়
রীতিমত বড় বড় নৌকো তাতে দাঁর বেয়ে চলে। কখনও দাঁড়ের বদলে বিশাল পাল খাটান হয়। একজন
মাঝি শুধু ছইয়ের উপরে হালটাকে শক্ত করে ধরে তাতে ঠেস দিয়ে বসে থাকে, আর বাতাসের
টানে নৌকো চলে ধীর গতিতে, তার কোথাও যাবার তাড়া নেই – আপন মনে চললেই হল। কখনও দেখি
ভাঁটার সময় মাঝিরা ওপার দিয়ে গুণ টেনে নিয়ে যাচ্ছে । অর্থাৎ একটা বিশাল মোটা দড়ি (
কাছি) দিয়ে নৌকোটাকে বেঁধে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
ঐ নৌকোগুলো সব আসে মেদিনীপুর, বিহার এইসব জায়গা থেকে। তাতে থাকে চাল,
সৈন্ধবলবণ, শুঁটকিমাছ –এই সব জিনিষ। বিশাল বড় বজরা নৌকা করে তারা আসে –আমাদের
পাশের বাড়ী যারা থাকেন তাদের কাছে – ব্যবসার জন্য। বাকি গুলোর কোনটায় বালি, কোনটায়
ইট , টালি , চুন ইত্যাদি নিয়ে – কারণ গঙ্গার এপারে অর্থাৎ পূবদিকে আমাদের
বাড়িগুলোর ফাঁকে ফাঁকে লাইন দিয়ে সব গোলা। ইটের গোলা, টালির গোলা, সুরকির গোলা। আর
আছে বিশাল বিশাল শিবের মন্দির - জগন্নাথের মন্দির, অভয়ামার মন্দির , রাধাকৃষ্ণের
মন্দির, শনির মন্দিরও আছে। আর আছে লম্বা লম্বা সিঁড়ি অলা ঘাট। যেমন গোপাল ঘাট, Mukherjee ঘাট, ভাঙ্গা ঘাট , বলরাম বসুর ঘাট। তেমনি কোন
কোন বাড়ির নিজস্ব ঘাট। যেমন আমাদেরটার নাম রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের ঘাট।
হ্যাঁ,আমরা তো রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের বাড়িতেই থাকি। ভাড়ায় থাকি। তাতে কিছু এসে
যায় না। আমরা আমাদের সব কিছু নিয়ে খুব খুশিতেই থাকি।
কখনও অবশ্য আমাদের বড়ির সামনেটায় গঙ্গায় পায়ের পাতা থেকে একটু ওপরে
জল। তাতে তো খুব সুবিধা ! একটা বালতি আর দা নিয়ে চলে যাই গঙ্গার ওপাড়ে। রোজ কত
কাজের জন্য গঙ্গার মাটি লাগে। এখন না নিয়ে এলে আর কখন আনব ? আর ওপারেই তো পরিষ্কার
মাটি পাওয়া যায়। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে এপারে তাকাই। ঐ তো মা বসে রান্না করছে ।
পরিষ্কার দেখেতে পাচ্ছি। তবুও বুকের কাছে কেমন করে। এক্ষুনি যদি জোয়ার এসে যায় ?
যদি আমার এপারেই কিছু হয়ে যায়ে? আর তো মা আমায়ে দেখতে পাবে না ! মা তো তখন খুব
কাঁদবে ! তাড়াতাড়ি মাটি তুলে ফিরে আসি এপারে। মা হাসে –‘এত মাটি তুলেছিস ? এত ভারি
বালতি নিয়ে এলি কি করে ?’ –ব্যাস আর কষ্ট নেই , আনন্দে অদৃশ্য কলার তুলি ফ্রকের –
হুঃ! আমি ছাড়া কে করে দেবে মাকে এসব কাজ ? দাদার তো অনেক পড়া। দিদি, বুদি, ছোড়দি ?
ওরা তো মেয়ে! ওরা যাবে পায়ের ওপর ফ্রক তুলে জল কাদা ভেঙ্গে ওপাড়ের মাটি আনতে?
হ্যাঁ, আমি ছিলাম মায়ের দ্বিতীয় ছেলে। ছেলেই তো হবার
কথা ছিল, নামও ঠিক হয়ে গেছিল – সুভাষ নয়ত উজ্জ্বল। তাইত উজ্বলা। আর আমাদের সেই
ঘাটের একদম নিজেদের নদী ? গঙ্গা । কিছু কিছু হিংসুটে লোক অবশ্য বলত টালি –নালা।
নালা? এটা নালা? নালাতে তো নর্দমার জল বয়। এত বড় বড় নৌকো বয়? আর টালি? এটা কি টালি
দিয়ে তৈরি ? পরে শুনলাম কোথায় যেন Tollygunge না কি একটা জায়গা আছে-তার নামে টালি –নালা। তাতো
বলবেই । ওদের ওখানে তো যখন বান আসে তখন ছাড়া জলই থাকে না। তাও শেষ অবধি সে- জল ও
যায় না। হিংসুটে আর কাকে বলে ? ওদের তো আর আমাদের মতো একদম নিজস্ব, খেলার মতো,
জড়িয়ে- মড়িয়ে থাকার মতো একটা গঙ্গা নেই ! আমি তো দেখিনি। না বন্ধুদের, না আত্মীয়
স্বজন , না বেপাড়ার লোক- কারোরই ‘আমাদের গঙ্গা’ বলার মতো, গর্ব করার মতো একটা
গঙ্গা নেই। শুধু আমাদেরই আছে একটা গঙ্গা। যার সাথে, যার ওপরে - খেলা করি, যাকে ভয়
পাই, যার সাথে কথা বলি – (মা বলেছে খারাপ স্বপ্ন দেখলে গঙ্গাকে বলতে)। তাই ওরা কি বলল তাতে আমার বয়েই গেল। আমি আমার গঙ্গার গল্প, আমার বন্ধুর গল্প, যা কিছু আমার
নিজের –সব বলব।
শুধু আজ আর না।